রামধনু


খবর-সাহিত্য-জীবনধারা

Subscribe

পিত্তথলিতে পাথর: কারণ, লক্ষণ, ঝুঁকি ও চিকিৎসা

রামধনু ওয়েব ডেক্স ।। ১৮ আগস্ট:

শল্য বিভাগে সবচেয়ে বেশি করা অস্ত্রোপচারগুলোর মধ্যে পিত্তথলির পাথর বা গলস্টোনের চিকিৎসা অন্যতম। পিত্তথলিতে পাথর হওয়া বিশ্বজুড়ে পরিপাকতন্ত্রের একটি সাধারণ সমস্যা। আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এই পাথর তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস, পিত্তথলির প্রদাহ এমনকি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

পিত্তথলি ও পিত্তরস কী?

লিভারের নিচে অবস্থিত ছোট থলির মতো অঙ্গকে বলা হয় পিত্তথলি। এটি সাধারণত প্রায় ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা। এর প্রধান কাজ হলো যকৃতে তৈরি পিত্তরস সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করে রাখা। খাবার হজমের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে চর্বি হজমে সাহায্য করে।

পিত্তথলিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়?

পিত্তরসে প্রধানত কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ ও বিলিরুবিন থাকে। এই উপাদানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সেই স্ফটিক জমে বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়। পিত্তরসে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকা, পিত্তথলি পুরোপুরি খালি না হওয়া, অতিরিক্ত বিলিরুবিন তৈরি হওয়া এবং পিত্তথলিতে সংক্রমণ বা প্রদাহ—পাথর তৈরির অন্যতম কারণ।

পিত্তথলির পাথর কত ধরনের?

সাধারণভাবে পিত্তথলির পাথর তিন ধরনের হতে পারে— কোলেস্টেরল পাথর: সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই ধরনের পাথর তৈরি হয়। পিগমেন্ট পাথর: বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে এই পাথর তৈরি হতে পারে। সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট লিভারের রোগ বা রক্ত-সম্পর্কিত অসুস্থতার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। মিশ্র পাথর: কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও বিলিরুবিনসহ একাধিক উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি হয়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে? ‘৫এফ’ সূত্র

পিত্তপাথরের ঝুঁকি বোঝাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রচলিত ‘৫এফ’ সূত্রের কথা বলা হয়। এগুলো হলো— ১. Female (নারী): পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে পিত্তপাথর বেশি দেখা যায়। ২. Forty (৪০): ৪০ বছরের পর ঝুঁকি বাড়তে থাকে। ৩. Fat (অতিরিক্ত ওজন): অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা ঝুঁকি বাড়ায়। ৪. Fertile (প্রজননক্ষম): বিশেষ করে গর্ভাবস্থা ও সংশ্লিষ্ট হরমোনগত পরিবর্তন ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ৫. Fair (ফর্সা): ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা ও ফর্সা ত্বকের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। তবে এটি কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগ হওয়ার নিশ্চিত কারণ নয়। এ ছাড়া স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, গর্ভাবস্থা, ইস্ট্রোজেনযুক্ত ওষুধ, পরিবারে পিত্তপাথরের ইতিহাস, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, দ্রুত ওজন কমানো, উচ্চ-চর্বিযুক্ত ও কম-ফাইবারযুক্ত খাবার, লিভারের রোগ, হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া এবং বয়স বৃদ্ধিও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ভারতে কতটা সাধারণ?

ভারতে পিত্তপাথর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। আনুমানিক ৫ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ জীবদ্দশায় কোনো না কোনো সময়ে পিত্তপাথর-সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই সমস্যা প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি দেখা যায় এবং বয়স ৪০ পেরোলেই ঝুঁকি বাড়তে থাকে। তবে তরুণদের মধ্যেও পিত্তপাথর দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে ক্রমবর্ধমান স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড গ্রহণের মতো কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রেই অন্য কারণে করা আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার সময় আকস্মিকভাবে পিত্তপাথর ধরা পড়ে।

কখন লক্ষণ দেখা দেয়?

পিত্তথলিতে পাথর থাকলেই যে উপসর্গ হবে, এমন নয়। অনেকেই বছরের পর বছর কোনো সমস্যা ছাড়াই থাকতে পারেন। তবে পাথর পিত্তনালীর পথে বাধা সৃষ্টি করলে বা প্রদাহ ও সংক্রমণ হলে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে— • পেটের ওপরের ডানদিকে তীব্র ব্যথা • ব্যথা পিঠ বা কাঁধে ছড়িয়ে পড়া • চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ব্যথা বাড়া • বমি বা বমি বমি ভাব • বদহজম • পেট ফাঁপা ও গ্যাস

কোন লক্ষণগুলো বিপজ্জনক?

কিছু লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। জ্বর, কাঁপুনি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, সাদা বা ফ্যাকাশে মল, তীব্র পেটব্যথা কিংবা ক্রমাগত বমি হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বিশেষ করে পেটের ওপরের ডানদিকে ব্যথা যদি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়, তার সঙ্গে জ্বর, বমি বা জন্ডিস থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

পিত্তথলির পাথর শনাক্ত করার সবচেয়ে প্রচলিত, সহজ ও কার্যকর পরীক্ষা হলো আল্ট্রাসাউন্ড। এর মাধ্যমে পিত্তথলিতে পাথর এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রদাহের লক্ষণও বোঝা যায়। প্রয়োজনে সিবিসি, লিভার ফাংশন টেস্ট, সিরাম বিলিরুবিন ও লিভার এনজাইম পরীক্ষা করা হয়। পিত্তনালীতে পাথর থাকার সন্দেহ হলে এমআরসিপি বা সিটি স্ক্যান করা হতে পারে। ইআরসিপি (ERCP) শুধু রোগ নির্ণয়ের জন্য নয়, কিছু ক্ষেত্রে পিত্তনালীতে আটকে থাকা পাথর অপসারণের জন্যও ব্যবহার করা হয়।

পিত্তথলির পাথরের চিকিৎসা কী?

যাদের পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে কিন্তু কোনো উপসর্গ নেই, তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে। কিন্তু বারবার ব্যথা হলে, পিত্তথলিতে প্রদাহ বা সংক্রমণ হলে কিংবা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে পিত্তথলির পাথরের উপসর্গযুক্ত রোগীদের জন্য ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি সবচেয়ে প্রচলিত ও স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি। এই অস্ত্রোপচারে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে পুরো পিত্তথলি অপসারণ করা হয়। এর সুবিধা হলো—ছোট ছেদ, তুলনামূলক কম ব্যথা ও রক্তপাত এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা। অনেক রোগী এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন।

কখন জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন?

পিত্তথলিতে তীব্র প্রদাহ, পিত্তথলি ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা, পিত্তনালীতে বাধা, সংক্রমণ বা পিত্তপাথরের কারণে অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা ও প্রয়োজনে দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

ওষুধে কি পিত্তপাথর গলানো যায়?

কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওষুধ ব্যবহার করে ছোট কোলেস্টেরল পাথর গলানোর চেষ্টা করা যায়। তবে এই চিকিৎসা সবার জন্য কার্যকর নয়। এতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও সময় লাগতে পারে এবং চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর আবার পাথর তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই যাদের বারবার উপসর্গ বা জটিলতা দেখা দেয়, তাদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারকে সাধারণত অধিক কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পিত্তথলি অপসারণ কি বিপজ্জনক?

পিত্তথলি অপসারণ নিয়ে অনেকের মধ্যেই ভয় থাকে। আসলে পিত্তথলি অপসারণের পরও লিভার স্বাভাবিকভাবে পিত্তরস তৈরি করতে থাকে। পিত্তরস সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করে। ফলে অধিকাংশ মানুষই পিত্তথলি অপসারণের পর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

পিত্তপাথর প্রতিরোধ করা যায়?

শতভাগ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। এজন্য— • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে হবে। • স্থূলতা কমাতে হবে, তবে দ্রুত ওজন কমানো এড়িয়ে চলতে হবে। • এমন খাদ্য বা পদ্ধতি এড়িয়ে চলা উচিত যাতে এক মাসে ২ থেকে ৪ কেজির বেশি দ্রুত ওজন কমে যায়। • প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ব্যায়াম করা ভালো। • ফল, শাকসবজি, দানা শস্য ও ফাইবারসমৃদ্ধ সুষম খাবার খেতে হবে। • ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত ভাজা খাবার, ঘি, মাখন, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার কমাতে হবে। • পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। • ডায়াবেটিস থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

পেটের ওপরের ডানদিকে বারবার ব্যথা হলে, বিশেষ করে ব্যথা ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হলে, জ্বর, বমি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া বা গাঢ় রঙের প্রস্রাব হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পিত্তথলির পাথর সাধারণ সমস্যা হলেও একে অবহেলা করা ঠিক নয়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই বারবার পেটের ওপরের ডানদিকে ব্যথা হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসাউন্ড করানোই নিরাপদ। সময়মতো রোগ নির্ণয়, যথাযথ চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর ওজন, সুষম খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়াম—পিত্তপাথরজনিত জটিলতা কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *