আজকের এই অতি-সংযুক্ত বিশ্বে (হাইপারকানেক্টেড ওয়াল্ড), আমরা কাজ, সামাজিকতা বা বিনোদনের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছি। যদিও প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করে তুলেছে, কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ডিজিটাল বার্নআউট সৃষ্টি করছে। যদি ক্লান্ত, খিটখিটে বা মনোযোগ দিতে অক্ষম বোধ করেন তাহলে হতে পারে আপনি ডিজিটাল বার্নআউটের শিকার।
আক্রান্ত তরুণ প্রজন্ম
সমাজমাধ্যমে বেশি সময় কাটাচ্ছে তরুণ প্রজন্মই। এর ফলস্বরূপ প্রচণ্ড মানসিক চাপ, বিষণ্ণতার শিকার হচ্ছে তারা। পরিশ্রম ছাড়াই ক্লান্তি চেপে বসছে শরীরে ও মনে।
হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের গবেষণা বলছেন, এখনকার প্রজন্ম মারাত্মক ভাবে ডিজিটাল বার্নআউটের শিকার। এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে সব সময়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ভয় কাজ করে। মানসিক ক্লান্তি এতটাই যে, তা অবসাদের দিকে নিয়ে যায় চুপিসাড়ে।
কয়েক হাজার সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীকে নিয়ে সমীক্ষা চালানো হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, স্কুল বা কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ডিজিটাল বার্নআউটের শিকার। তবে তালিকায় প্রাপ্তমনস্কেরাও রয়েছেন। গবেষণা বলছে, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের মানসিক চাপের কারণ বিভিন্ন সমাজমাধ্যম। সেখানে অতিরিক্ত সময় কাটানোয় ৯০ শতাংশ ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। কম ঘুমের জেরে তৈরি হচ্ছে মানসিক চাপ। যার মধ্যে ৬০ শতাংশ সম্পর্ক হারানো বা সামাজিক সম্মান হারানোর মতো বিভিন্ন আশঙ্কায় ভুগছেন। আবার অনেকে মানসিক চাপ কমাতে নানা রকম নেশায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। রোজের যাপনে, পারিবারিক নানা সম্পর্কে খারাপ প্রভাব ফেলছে সমাজমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি।
মনোরোগ চিকিৎসকদের মতে, সমাজমাধ্যম আরও বেশি ভোগবিলাসী করে তুলছে। ভার্চুয়াল বন্ধুর বাড়ি, গাড়ি বা দামি জিনিসপত্রের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে দেখানো বিলাসী জীবনযাত্রা দেখে তার প্রতি ঈর্ষাও তৈরি হচ্ছে। এর থেকে স্নায়বিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছোচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যমে দেখা সেই কাল্পনিক জগতের সঙ্গে নিজের জীবনকে মেলাতে না পারার ক্ষোভ অবসাদের জন্ম দিচ্ছে। আত্মঘোষিত ‘সুখী’ গৃহকোণগুলির বিজ্ঞাপন দেখে অন্যের প্রতি বিষাদও বাড়ছে।
এখানেই শেষ নয়। সমাজমাধ্যমে বন্ধুত্ব পাতাতে গিয়েও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সমীক্ষার রিপোর্ট জানাচ্ছে, কমবয়সিদের অনেকেই বলছেন- অচেনা ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ এলে আতঙ্ক হয়। কারণ অনুরোধকারীর উদ্দেশ্য কী, তারা পরে কী আচরণ করবেন, সেটা বলা মুশকিল। আবার অনেকে জানিয়েছেন, সমাদমাধ্যমের বন্ধুত্ব ও সেখানে বিচ্ছেদ হলে হতাশা আরও বাড়ছে। নিজের পোস্টে যথাযথ ‘লাইক’ ও ‘কমেন্ট’ না পেলেও তীব্র মনোকষ্ট তৈরি হচ্ছে, যা বিষাদের কারণ হয়ে উঠছে।
এর থেকে রেহাই পাওয়ার পথটা কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। সমাজমাধ্যমের কুফলগুলি নিয়ে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করলে হয়তো বিষয়টা অনেক সহজ হবে। তা ছাড়া পাঠ্যক্রম বহির্ভূত নানা কাজে ব্যস্ত থাকা জরুরি। ভার্চুয়ালের জায়গায় মুখোমুখি আদানপ্রদানের বন্ধুত্ব ফিরে আসা জরুরি। নিয়মিত বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো ভার্চুয়াল জগতের নেশা ছাড়াতে সাহায্য করবে। এছাড়া সাহায্য নেয়া যেতে পারে মনোবিদের।
ডিজিটাল বার্নআউট কী?
ডিজিটাল বার্নআউট হলো দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে থাকা এবং ক্রমাগত সংযুক্ত থাকার কারণে সৃষ্ট মানসিক, শারীরিক ও আবেগিক অবসাদের একটি অবস্থা। যারা দূর থেকে কাজ করেন বা ব্যস্ত অনলাইন জীবনযাপন করেন, তাদের মধ্যে এটি ক্রমশ সাধারণ হয়ে উঠছে।
ডিজিটাল বার্নআউটের সাধারণ লক্ষণসমূহ :
১. ক্রমাগত ক্লান্তি
পুরো রাতের ঘুমের পরেও আপনি সারাদিন ক্লান্ত এবং নিস্তেজ বোধ করেন।
২. মনোযোগের অভাব
যে কাজগুলো একসময় সহজ মনে হতো, এখন সেগুলো কঠিন মনে হয় এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়।
৩. আবেগিক অস্থিরতা
সাধারণের চেয়ে বেশি খিটখিটে, উদ্বিগ্ন বা অস্থির বোধ করা।
৪. শারীরিক অস্বস্তি
ঘন ঘন মাথাব্যথা, চোখ শুকিয়ে যাওয়া এবং ঘাড় বা কাঁধে ব্যথা হলো বিপদের সংকেত।
কীভাবে ডিজিটাল বার্নআউট কাটিয়ে উঠবেন :
১. আপনার স্ক্রিন টাইম সীমিত করুন
কাজ এবং অবসরের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করুন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করুন।
২. ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ করুন
প্রতি ২০ মিনিটে, ২০ সেকেন্ডের জন্য বিরতি নিন এবং চোখের চাপ কমাতে ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে মনোযোগ দিন।
৩. একটি ডিজিটাল ডিটক্স চেষ্টা করুন
সপ্তাহে একটি দিন অফলাইনে থাকার জন্য উৎসর্গ করুন। এই ছোট পরিবর্তনটি আপনার মানসিক স্বচ্ছতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে।
৪. মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন করুন
মানসিক চাপ সামলাতে এবং আপনার শক্তিকে পুনরায় কেন্দ্রীভূত করতে ধ্যান বা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন।
৫. শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন
নিয়মিত ব্যায়াম ডিজিটাল বার্নআউটের কারণে সৃষ্ট ক্লান্তি দূর করতে পারে। এমনকি ১৫ মিনিটের হাঁটাও পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
ডিজিটাল বার্নআউট একটি আধুনিক সমস্যা, তবে সঠিক কৌশলের মাধ্যমে এটি মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রযুক্তির সাথে স্বাস্থ্যকর সীমানা তৈরি করে আপনার মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিন। মনে রাখবেন, আপনার স্বাস্থ্যই প্রথম—বাকি সবকিছু অপেক্ষা করতে পারে।