রামধনু ওয়েব ডেক্স।। ১৯ আগস্ট:
মিশরের প্রাচীন নগরী লুক্সর। হাজার বছরের ইতিহাস, রাজাদের সমাধি আর বিশাল মন্দিরের জন্য শহরটি পরিচিত ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত জাদুঘর’ হিসেবে। তবে আগামী বছর এই ঐতিহাসিক শহরেই ঘটতে যাচ্ছে বিরল এক মহাজাগতিক দৃশ্য।
২০২৭ সালের ২ আগস্ট লুক্সরের আকাশে দিনের বেলায় নেমে আসবে গভীর অন্ধকার। ওই দিন পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় প্রায় ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড সূর্য পুরোপুরি ঢেকে থাকবে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২১১৪ সালের আগে পৃথিবীর আর কোথাও এত দীর্ঘ সময় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। এ কারণে এই গ্রহণকে এরই মধ্যে ‘শতাব্দীর সূর্যগ্রহণ’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
কোথা থেকে দেখা যাবে গ্রহণ?
২০২৭ সালের এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ উত্তর আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে দেখা যাবে।
আটলান্টিক মহাসাগর থেকে গ্রহণের ছায়া এগিয়ে প্রথমে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল ও জিব্রাল্টারে পড়বে। এরপর তা মরক্কোর উত্তরাঞ্চল, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও মিশরের ওপর দিয়ে যাবে। এরপর ছায়াপথ সৌদি আরব, ইয়েমেন ও সোমালিয়া অতিক্রম করে ভারত মহাসাগরে গিয়ে শেষ হবে। পূর্ণগ্রহণের এই পথের সর্বোচ্চ প্রস্থ হবে প্রায় ২৫৯ কিলোমিটার বা ১৬১ মাইল। ফলে স্পেনের কাদিজ, মরক্কোর টাঙ্গিয়ার, আলজেরিয়ার ওরান, লিবিয়ার বেনগাজি এবং সৌদি আরবের জেদ্দার মতো শহর থেকেও বিরল এই দৃশ্য দেখা যাবে। তবে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় পূর্ণগ্রহণ দেখার সুযোগ থাকবে লুক্সরে।
কেন লুক্সর এত বিশেষ?
লুক্সর প্রাচীন মিশরের গুরুত্বপূর্ণ শহর থিবসের ওপর গড়ে উঠেছে। শহরটির এক পাশে ভ্যালি অব দ্য কিংস এবং অন্য পাশে ভ্যালি অব দ্য কুইন্স। এই ঐতিহাসিক স্থাপনার মাঝেই দিনের আলো কয়েক মিনিটের জন্য হারিয়ে যাবে। এটি হবে ১৯৯১ সালের পর স্থলভাগ থেকে দেখা সবচেয়ে দীর্ঘ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ।
জ্যোতির্পদার্থবিদদের মতে ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড খুবই দীর্ঘ সময়। এতক্ষণ অন্ধকার থাকায় মানুষের চোখ ধীরে ধীরে সেই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। সাধারণত পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় উজ্জ্বল কয়েকটি তারা ও গ্রহ দেখা যায়। তবে এবার আরও বেশি মহাজাগতিক বস্তু দেখা যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিষ্কার আকাশের সম্ভাবনা
সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য লুক্সরের আরেকটি সুবিধা হলো পরিষ্কার আকাশের সম্ভাবনা। কানাডীয় আবহাওয়াবিদ জে অ্যান্ডারসনের মতে, গ্রীষ্মকালে লুক্সরে সাধারণত মেঘের পরিমাণ খুব কম থাকে। তবে সাহারা ও আরব মরুভূমি থেকে উড়ে আসা ধুলা কিছুটা সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে প্রচণ্ড গরম। আগস্টে লুক্সরের দিনের তাপমাত্রা প্রায়ই ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে। গ্রহণের সময় তাপমাত্রা কিছুটা কমবে। কিন্তু ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ওপর অতিরিক্ত তাপের প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের পর আংশিক গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা। দুপুর ১টা ৫ মিনিটের দিকে পূর্ণগ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
পর্যটকদের ভিড় নিয়ে শঙ্কা
এই মহাজাগতিক ঘটনা দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ লুক্সরে ছুটে যেতে পারেন। আর সেটিই এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে। গ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে মেঘ বা ধুলার চেয়ে পর্যটকদের ভিড়ই বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় জড়ো হলে হোটেল পাওয়া কঠিন হবে। সড়কেও তৈরি হতে পারে তীব্র যানজট।
এরই মধ্যে লুক্সরের হোটেলগুলোর ওপর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বুকিং ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছরের গ্রহণের সময় লুক্সরে প্ল্যাটফর্মটিতে থাকা ৯০ শতাংশের বেশি থাকার জায়গা এরই মধ্যে বুক হয়ে গেছে।
অবশিষ্ট কিছু হোটেলের এক রাতের ভাড়া ২ হাজার পাউন্ডেরও বেশি, যা প্রায় ২ হাজার ৬৯৫ ডলার।
কোটি টাকার পর্যটন
সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে বিশেষ ভ্রমণ প্যাকেজ চালু হয়েছে। নয় দিনের একটি ভ্রমণ প্যাকেজের মূল্য শুরু হয়েছে ৪ হাজার ৯৫০ পাউন্ড বা প্রায় ৬ হাজার ৬০০ ডলার থেকে। সেটিও পুরোপুরি বুক হয়ে গেছে। হার্ভার্ড অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের এক সপ্তাহের বিশেষ ভ্রমণ কর্মসূচির জনপ্রতি খরচ প্রায় ২৬ হাজার ৯৫০ ডলার। এতে লন্ডন থেকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে গিজা হয়ে লুক্সরে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
আফ্রিকায় বাড়ছে অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজম
এই সূর্যগ্রহণ আফ্রিকার মহাকাশভিত্তিক পর্যটন বা ‘অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজম’কে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। বিশ্বজুড়ে আলোকদূষণ বাড়ছে। ফলে অনেক মানুষ এখন রাতের আকাশে মিল্কিওয়ে পর্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে পারেন না। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মিল্কিওয়ে দেখতে পারেন না। উত্তর আমেরিকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষও এর বাইরে।
আফ্রিকার কয়েকটি দেশ অবশ্য এখনো তুলনামূলকভাবে অন্ধকার আকাশ ধরে রেখেছে। চাদ, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও মাদাগাস্কার আলোকদূষণের দিক থেকে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। নামিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাও অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজমের জন্য নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কারু মরুভূমির রাতের আকাশ এতটাই পরিষ্কার যে টেলিস্কোপ ছাড়াই প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরের মহাজাগতিক বস্তু দেখা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, ২০২৭ সালের ২ আগস্টের সূর্যগ্রহণ শুধু একটি মহাজাগতিক ঘটনা নয়। প্রাচীন মিশরের ঐতিহাসিক স্থাপনার পটভূমিতে কয়েক মিনিটের এই অন্ধকার বিশ্বজুড়ে পর্যটক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও মহাকাশপ্রেমীদের জন্য হয়ে উঠতে পারে এক বিরল অভিজ্ঞতা।
-প্রতীকী ছবি
