রামধনু


খবর-সাহিত্য-জীবনধারা

Subscribe

ভারতে কি ডিজিটাল লেনদেনে গুনতে হবে মাশুল ? UPI নিয়ে নতুন বিতর্ক

রামধনু ।। ৭ আগস্ট

প্রধানমন্ত্রী মোদি নোট বাতিল করে নগদ লেনদেনের বদলে দেশে ডিজিটাল লেনদেন চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার প্রচারেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। সেই সময় ডিজিটাল লেনদেনে কোনো ধরনের চার্জ বসানো আইনত নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার সেই চার্জ-সংক্রান্ত আইনি নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে ডিজিটাল লেনদেনে দেদার চার্জ বসানোর উদ্দেশ্যে আইন সংশোধনের বিল এনেছে কেন্দ্র। গত ৪ আগস্ট সংসদে এ বিষয়ক 'কর ও অন্যান্য আইন (সংশোধনী) বিল' পেশ করেছে কেন্দ্র।

কেউ কেউ বলছেন, এই আইন সংশোধিত হলে এবার থেকে পেটিএম, ই-রুপিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের জন্য গ্রাহকদের চার্জ গুনতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি ১০০ টাকার কেনাকাটায় গ্রাহকদের ১ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ দিতে হতে পারে। বর্তমানে প্রতি মাসে আনুমানিক ২, ০০০ কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন কোনও চার্জ ছাড়াই সম্পন্ন হয়। এবার সেখানে চার্জ বসানোর পথ অবাধ করায় বিপুল মুনাফা করবে মূলত ডিজিটাল লেনদেন খাতের কর্পোরেট সংস্থাগুলি, কারণ এই বাজারে তাদেরই একচ্ছত্র প্রাধান্য রয়েছে। অনেকেই বলছেন, মোদি সরকার ডিজিটাল লেনদেনে চার্জ বসানো ঠিক না। কেননা, প্রধানমন্ত্রী নিজে সাধারণ মানুষকে নগদ লেনদেন ছেড়ে ডিজিটাল মাধ্যমে উৎসাহিত করেছিলেন এবং সেখানে চার্জ নেওয়া আইনত নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল। এখন মানুষ যখন এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, তখন সরকার নিজেই চার্জ বসানো অবাধ করে দিচ্ছে। এই বিল অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের পর বাজারে তীব্র নগদ সংকট দেখা দেয়। সেই সময় সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পেটিএমসহ বিভিন্ন ডিজিটাল কর্পোরেট সংস্থার হয়ে প্রচার চালানোর পাশাপাশি সংস্থাগুলিকে উৎসাহ ভাতা দেওয়ার উদ্যোগও নেয় মোদি সরকার। নগদের ঘাটতি থাকায় সেই সময় বহু ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন শুরু করেন এবং স্থায়ী গ্রাহকে পরিণত হন।

পরবর্তীকালে ডিজিটাল লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়গুলি পরিচালনার জন্য 'পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০১৭' চালু হয়। এতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি চার্জ নেওয়া নিষিদ্ধ করতে নির্দিষ্ট ধারা যুক্ত করা হয়। আইনের ১০(ক) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল 'কোনও ব্যাঙ্ক বা ডিজিটাল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্রাহকের ডিজিটাল লেনদেনের ওপর কোনও চার্জ বসাতে পারবে না।' কিন্তু সংসদে পেশ করা নতুন সংশোধনী বিলে এই ১০(ক) ধারাটি বিলুপ্ত করে ডিজিটাল লেনদেনে ইচ্ছেমতো চার্জ বসানোর সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে অনেকের ধারনা।

একাংশের বক্তব্য, ডিজিটাল লেনদেনে চার্জ বসানো কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত এক দশক ধরেই ব্যাঙ্কিং পরিষেবার নানা ক্ষেত্রে চার্জ বেড়ে চলছে। যেমন ন্যূনতম অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স না থাকলে জরিমানা, এটিএম থেকে টাকা তোলার ফি বৃদ্ধি, ডেবিট কার্ডের বাৎসরিক ফি ও জরুরি এসএমএস চার্জ বাড়ানো ইত্যাদি। এখন সাধারণ মানুষ যখন ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, ঠিক তখনই নিয়মিত ব্যাঙ্ক পরিষেবার মতো এতেও চার্জ বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলো।

উল্লেখ্য, ২০২০ সাল থেকে 'ভিম-ইউপিআই', 'রু পে' ও ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনে কোনও চার্জ নেওয়া হতো না। তবে কর্পোরেট সংস্থাগুলি দীর্ঘদিন ধরেই এই পরিষেবায় চার্জ বসানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। সেই দাবি মেনে অর্থ মন্ত্রক সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ডিজিটাল লেনদেনে চার্জ বসানোর সুপারিশ করে। অর্থ মন্ত্রকের দাবি, চার্জ না বসালে এই পরিকাঠামো পরিচালনা করা সম্ভব নয়। চলতি বছরের শুরুতেই অর্থ মন্ত্রক এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং গত জুন মাসে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। সেই অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে পরিণত করতেই এবার সংসদে বিল পেশ করা হয়েছে।

তবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন স্পষ্ট করেছেন, সাধারণ গ্রাহকের ওপর এখনই কোনও UPI চার্জ চাপানো হচ্ছে না। সম্ভাব্য MDR নিয়ে আলোচনা হলেও তা গ্রাহকের ওপর নয়, ব্যবসায়ীর ওপর প্রযোজ্য হতে পারে। তিনি বিরোধীদের সেই আশঙ্কা খারিজ করেছেন যে সাধারণ মানুষকে UPI ব্যবহারের জন্য সরাসরি টাকা দিতে হবে।

ভারতে UPI লেনদেনের পরিমাণ বিপুল হারে বেড়েছে। কিন্তু PhonePe, Google Pay, Paytm-এর মতো পেমেন্ট সংস্থাগুলি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে সম্পূর্ণ শূন্য-MDR ব্যবস্থায় অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণের খরচ মেটানো কঠিন হচ্ছে। এই কারণেই সরকার ও নীতিনির্ধারক মহলে একটি টেকসই রাজস্ব মডেল নিয়ে আলোচনা চলছে।

কোন লেনদেনে চার্জ আসতে পারে?

এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আলোচনায় থাকা একটি প্রস্তাব অনুযায়ী— ₹২,০০০-এর বেশি UPI পেমেন্টে MDR আরোপ হতে পারে, এবং তা মূলত বড় ব্যবসায়ী বা উচ্চ টার্নওভারযুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, UPI লেনদেনের প্রায় ৯৫ শতাংশই ₹২,০০০-এর নিচে, ফলে ছোট অঙ্কের দৈনন্দিন পেমেন্টে চার্জ না-আসার সম্ভাবনাই বেশি।

সরকার কি ইতিমধ্যেই চার্জ চালু করেছে?

উত্তর হলো একেবারেই না। বিলটি শুধু সরকারকে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে এমন চার্জ অনুমোদনের আইনি ক্ষমতা দিচ্ছে। চার্জ চালু করতে হলে আলাদা সিদ্ধান্ত, নিয়ম এবং বিজ্ঞপ্তি প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (P2P) এবং অধিকাংশ ব্যক্তি থেকে ব্যবসায়ী (P2M) UPI লেনদেন বিনা খরচেই চলছে। UPI-তে অবিলম্বে চার্জ বসছে— এমন দাবি সঠিক নয়। বরং সরকার ভবিষ্যতের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনে ব্যবসায়িক পর্যায়ে MDR ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। ফলে সাধারণ গ্রাহকের দৈনন্দিন ডিজিটাল পেমেন্ট আপাতত আগের মতোই ফ্রি থাকছে, যদিও উচ্চ মূল্যের বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।

One thought on “

ভারতে কি ডিজিটাল লেনদেনে গুনতে হবে মাশুল ? UPI নিয়ে নতুন বিতর্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *